“আসলে ছোটবেলাটাই ভাল ছিল, কত সুন্দর না ছিল সেই দিনগুলো” আমরা সবাই বড় হওয়ার পর একবার না একবার এই কথাটাই বলি। । কোন রাগারাগি ছিলনা, ছিলনা কোন ভুল বোঝাবুঝি, জানতাম না মিথ্যা কথা বলা, সত্যি কথা বলতে অনুভূতিটাই অন্যরকম ছিল।
আমরা আজ বড় হওয়ার পর একটা জিনিস বুঝেছি, ছোটবেলা সবাই ভাবতাম কবে বড় হব। আর এখন এটাই ভাবি যে কেন বড় হলাম ছোটবেলায় তো বেশ ভালো ছিলাম। কতোইনা ভালো ছিল দিনগুলো। ছিলনা মন-কষাকষি, জানতাম না ইগো কি, অপমান কি? নিজেদের মধ্যে অনেক ঝগড়াঝাঁটি ছিল ঠিকই, তবে ঝগড়াঝাঁটি শেষে একসাথে হাত ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরাটার মধ্যেও একটা অন্যরকম মজা ছিল। হ্যাঁ, ঠিক ভুল হিসাবটা তখন অত ভালো করে বুঝতাম না। সেটাই বোধহয় বেশি ভালো ছিল।
ছোটবেলায় কত ভেবেছি বড় হয়ে অনেক কিছু করব। ছোটবেলাটা ভালো না, বড় হলে অনেক মজা হবে। তখন ছোটবেলায় বুঝতাম না বড় হওয়ার পর কখনো সেই ছোটবেলাতেই আমরা ফিরতে চাইবো। আসলে এই যে দায়িত্ব ব্যাপারটা আছে, সেটা ছোটবেলায় বুঝতাম না।
আসলে এখন আমাদের মনটা যেমন জটিল ছোটবেলায় এরকম ছিল না ছোটবেলায় অনেক সরল মন ছিল সহজেই সবাইকে বিশ্বাস করতাম, কেউ কাউকে ঠকাতো না। আসলে তখন নিজেদের মধ্যে এই ঠকানো ব্যাপারটা ছিল না। ভালো হলেও, আর খারাপ হলেও মুখের উপর বলতাম, লুকিয়ে-চুরিয়ে ব্যাপারগুলো ছোটবেলায় একদমই ছিলনা।
স্কুলে কোন অনুষ্ঠান হোক, খেলাধুলা অথবা প্রতিযোগিতা সবকিছুতেই এগিয়ে আসতো সেই লাস্ট বেঞ্চের স্টুডেন্টরাই।
বন্ধুত্বের পাশাপাশি ছোটবেলায় আরেকটি বিষয় ছিল, যেটি ছিল স্কুল টিচার কে নিয়ে মজা করা বিভিন্ন নাম দেওয়া, ক্লাসের মাঝে হঠাৎ করে স্যারকে আমাদের দেওয়া বিভিন্ন নাম ধরে ডেকে তারপর চুপ করে যাওয়া। স্যার বুঝতেই পারতো না যে স্যারকে ওই নামে কে ডাকছে। তখন স্যারের কড়াকড়ি একটু বেশিই বেড়ে যেত।
আর সেই শিক্ষক এর কথা সকলেরই মনে আছে, যে ক্লাসে এসেই বেতের বাড়ি দিত। আর কেউ কোন কোন স্যার ছিল যারা ক্লাসে সত্যি খুব ভালো পড়াতো, সারা ক্লাস সেই স্যারকে খুব ভালোবাসতো। কখনো কখনো কোন কোন স্যারের উপর খুব রাগ হতো। আর সেই স্কুলের ম্যাডাম টা যার ওপর ক্রাশ সবারই ছিল। আবার সেই ম্যাডামটা ক্লাসের ফার্স্ট বয় অথবা সেকেন্ড বয় কে একটু বেশিই ভালবাসতো।
যেই উচ্চমাধ্যমিকটা পাশ হল মনে মনে ভাবতাম কলেজে গিয়ে সেই মজা হবে। কত বন্ধু আলাদা কলেজে ভর্তি হলো অনেক বন্ধুর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। কলেজের শুরু হল, দুদিন ঘোরাফেরা বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখা কিন্তু তখনও সবশেষে আবার সেই সবাই স্কুল লাইফটাকেই মিস করতাম।
আবার রাস্তা ঘাটে যাওয়ার সময় যদি সেই পুরনো স্কুলের ম্যাডাম বাসের সাথে দেখা হয়ে যেত যাকে সবচাইতে ভয় পেতাম, প্রণাম করতে যেতাম, কত সুন্দর সেই স্যার কথা বলতো। “কিরে ভালো আছিস? তো বাড়িতে সবাই ভালো তো? এখন কি করছিস?” – তখন নিজেরাই ভাবতাম এই স্যার কে আমি এত ভয় পেতাম। এভাবেই দেখতে দেখতে কলেজ লাইফটা শেষ হয়ে গেল।
কলেজ শেষ হওয়ার এক দু’বছরের মধ্যেই জীবনটা কেমন যেন পাল্টে যেতে লাগল। কেউ কেউ চাকরির জন্য পড়াশোনা, কোন কোন বন্ধু অলরেডি চাকরি পেয়ে গেছে আর্মি অথবা ডিফেন্স লাইনে, কেউ হয়তো অন্য কিছু কাজ করছে যেমন গান,নাচ, আঁকা সেখানে কেউ পারদর্শী। আর বছর দুই যেতেই এবার যেন একটু অন্যরকম জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা হতে থাকলো। কিছু কিছু মানুষের কাছের মানুষ গুলোই তাকে ছেড়ে চলে গেল। চাকরি না পাওয়ার কারণে কত ছেলে মেয়ের প্রেম ভেঙে গেল। অভিজ্ঞতা সবাই একটাই প্রধানত পায় যে এ পৃথিবীতে স্বার্থ ফুরালে সবাই চলে যায়। মানে এই বয়সটা আমাদের বাস্তবটা শিখিয়ে দেয়, বলে দেয় যে এ পৃথিবীতে স্বার্থ ফুরালে সবাই চলে যায়।”আর প্রেম পায় না” জীবনে কিছু করতে হবে” -এই একটা কথাই বারবার মনে হয়। ইতিমধ্যে কত বন্ধু বান্ধবীর বিয়ে হয়ে যায়, কারো কারো আবার তো বাচ্চা হয়ে যায়। দেখা হলে বলি, কিরে তোর বিয়ে হয়ে গেছে। পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হলে কখনো কখনো বলি চাকরি পেয়ে গেছে বলে ওর ইগো বেড়ে গেছে, কেউ আবার দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মুখ ফেরায় না শুধু লাস্ট বেঞ্চের সেই বন্ধুরা, যাদের সাথে একসময় প্রচুর মারামারি করেছি, আড্ডা দিয়েছি। এভাবেই জীবনটা ঠিক কেটে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, সত্যি আজ আমরা অনেকটাই বড় হয়ে গেছি। কেউ হয়তো এখনও একা আছি, কেউ আবার এখন সংসারী। কিন্তু সবার মধ্যে থেকেও হয়তো আমরা একা। আজও কি আমরা সত্যিই নিজেদের চিনতে পেরেছি? জানা নেই, এতটা পথ পার হয়েও এসেও কখনো কখনো আমরা নিজেকেই খুঁজে চলি। আজও আমরা প্রতিনিয়ত এই জীবনকে উপলব্ধি করে চলেছি আর খুঁজে চলেছি এই জীবনের মানে।
সুমিত গুহ
উপসংহার-
আশা করছি আপনাদের Bangla Golpo সেগমেন্ট টি ভালো লেগেছে। কেমন লাগলো আজকের গল্পটি।
যদি গল্পটি ভালো লেগে থাকে তবে আপনার মতামত নিচে কমেন্ট বক্সে জানান আর এরকমই আরও গল্প পেতে বা আপনার নিজের গল্প এখানে পোস্ট করতে আমাদের মেইল করুন ঠিকানায়।
